(Tot র ওয়েব জিন এর জন্যে নাটক) | নাটক :: উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়

কমলঅমিতগার্গী
সত্তর পেরোনো এক মানুষকমলের বড় ছেলেঅমিতের বউ
সুমিতকিটিঅর্ণব
কমলের ছোট ছেলেকমলের মেয়েকিটির লিভ ইন পার্টনার
আনন্দনীতাসীতা
অর্ণবের বাবাঅর্ণবের মাএক যুবতী মেয়ে, দেহাতি
রবি
কমলের বন্ধু ও ডাক্তার

দৃশ্য ১

মঞ্চে একটি বসবার ঘর। সেটি প্রয়োজন মতো অমিতের ঘর বা কিটির ঘরে রূপান্তর নেবে সামান্য প্রপস এর বদলের মাধ্যমে। বসার ঘরে একটি মহিলার পুরোনো বাঁধানো ছবি। মালা ঝুলছে।ইনি কমলের মৃতা স্ত্রী।

কিছু পুরোনো কিছু নতুন আসবাব আছে ঘরে।একটি অচল টেলিভিশন আছে। বসার ঘর থেকে আমরা মনে মনে কমলের শোবার ঘর বা অন্য কারো ঘরে যাবার পথ আছে বলে কল্পনা করব। এবং সেই ভাবেই অভিনয় হবে।

এখন বেশ ভোর বেলা। কেউ নেই। বেল বাজে। ভিতর থেকে চোখ রগড়াতে রগড়াতে গার্গী আসে। পরনে রাতের পোশাক। দরজা খোলার আগেই ঘরে আসে কিটি। সঙ্গে একটা স্যুটকেস।

কিটি।। দরজা তো খোলা। কি ব্যাপার!

গার্গী।। তাহলে বাবুজি মনে হয় সকালে হাঁটতে গেছে। তুই এই ভোর বেলা? কি ব্যাপার?

কিটি।। দরজা তো লক করে দিয়ে যায় বাবা।। অদ্ভুত।

গার্গী।। চাবি নিয়ে যান নি হয়ত। বাবার আজকাল কিছু মনে থাকে না। কিন্তু তুই এই সাত সকালে? আবার সঙ্গে বাকসো? জ্বালাতে এলি তো আবার। থাকবি না কি?

কিটি।। দেখ বৌদি বাবার ঘরে মেয়ের ফুল রাইট। তার কোনো সাত সকাল কি গভীর রাত হয় না। আর আমার একটা ঘর অব্দি আছে।

গার্গী।। একটি পাজি ননদ। উফফ। আবার ঝগড়া করে এলি? সেই অর্ণব মাল টাকে ফেলে চলে এলি?

কিটি।। আগে চা দে। আজ একটা অন্য কেস। একদম সিরিয়াল কেস। আমরা বিয়ে করছি। অর্ণবের বাবা মা আজ রাতে আসছে এই খানে।

গার্গী।। আরে এ কি রে! বিয়ে কেউ করে! লিভ ইন থেকে বিয়ে?

কিটি।। তুই যে দাদাকে করলি

গার্গী।। আমার সঙ্গে কেউ লিভ ইন করলো না তাই। আমার তো সোজা রাস্তায় বিয়ে। নইলে ওই কনজারভেটিভ ন্যাকা এক বর তোর দাদা। একটা তেতো মাল। ইস। ভুল করিস না। বিয়ে করলেই অর্ণব কে করলা সেদ্ধ মনে হবে।

কিটি।। আরে অর্ণব বাচ্চা চায়। বলছে বাচ্চা প্রবলেম এ পড়ে যাবে ফরমাল বাবা মা না হলে।

গার্গী।। বলছে?

কিটি।। আসলে ও বাবা মা কে খুশি করতে চায়। বাবা নাকি নাতি কে অনেক সম্পত্তি দিয়ে যাবে প্রমিস করেছে।

গার্গী।। অর্ণব কে দেবে না?

কিটি।। আরে বিয়ে না করলে দেবে না। তাই নাতি ফাতি বলছে। ওর বাপ যা জিনিস

গার্গী।। নাতনি হলে দেবে?

কিটি।। ছেলেই হবে। ওই সব টাইম দেখে .... মানে মেথড আছে…ছেলে হবে

গার্গী।। তাহলে মেয়ে চাইলে তার ও ......টাইম আছে

কিটি।। সব আছে। মিলবেই। কিন্তু দাদা কি মেয়ে চায়?

গার্গী।। ও তো সংসার বাড়াতে চায় না। ও নাকি সাধনা করতে পাহাড়ে চলে যাবে।

অমিত আসে

অমিত।। কার গলা এই সাত সকালে?

কিটি।। দাদা ,আমি

অমিত।। বোন টি আমার। এসেছো? কি প্রয়োজন? লিভ ইন কি আউট হয়ে গেলো?

কিটি।। আরে আমরা বিয়ে করছি।

অমিত।। কি? কি? আবার বল

কিটি।। বিয়ে বিয়ে!

অমিত।। মানে সনাতন প্রথা। মন্ত্র পড়ে?

কিটি।। ইয়েস। একদম।

অমিত।। গার্গী কি খুশির খবর আজ। এইটা যে হোক আমি চাইতাম।

গার্গী।। ওদের একটা ফুটফুটে ছেলেও হবে

অমিত।। মানে? হলে হবে

গার্গী।। আমার একটা মেয়ে হবে?

অমিত।। তোমার?

গার্গী। হলে হবে। না কি?

অমিত বিরক্তি প্রকাশ করে

অমিত।। বাবা কে ডাকি। বাবা? শোনো কিটি বিয়ে করবে।

কিটি।। সম্ভবত বাবা ঘরে নেই। বাইরে গেছে। দরজা খোলা ছিল।

অমিত বাবার ঘরে উঁকি মারে।

অমিত।। আরে বাবা তো নেই ঘরে।

গার্গী।। দেখি

গার্গী ভিতরে যায়... ফিরে আসে

গার্গী।। গজব। টান টান বিছানা। রাতে কেউ শোয় নি বলে মনে হয়।আচ্ছা বাবা রাতে যে বেরোলো ‘তোমরা শুয়ে পড়ো’ বলে .....আমি তো ফেরার শব্দ পাই....কিন্তু

গার্গী।। সর্বনাশ। কাল কোনো শব্দ পাও নি?

সবাই ছুটে বাবার ঘরে যায়। ফিরে আসে গার্গী ও কিটি। একটি তুমুল কলহ শুরু হয়ে যায়

কিটি।। তুমি যে রাতে বাবার ফেরার শব্দ পেলে না তারপরেও একবার চেক করে দেখলে না?

গার্গী।। আরে কি বিপদ। তুমি কি এখানে থাকো? তোমার বাবা কি কি কান্ড করেন তুমি তার সম্পর্কে  কি স্পষ্ট ভাবে কিছু জানো?

কিটি।। তোমরা থাকো। তোমরা জানো। আমি তোমার মতো জানি না। তাই তোমার রেসপনসিবিলটি হলো তোমার জানা অনুযায়ী এই বুড়ো টার কেয়ার নেওয়া।

গার্গী।। না। আমি পারব না। তোমার দাদার বাবা। আমার নয়।

কিটি।। বাবা তোমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। হয়ত দাদার চেয়ে বেশি। বাবা তো তোমাকে বলে গিয়েছিল যে একটু ঘুরে আসছি

গার্গী।। আমি ওই রকম একটা শুনেছি মনে হচ্ছে। না না বাবা কিছু বলে যান নি

অমিত।। তুমি কি কি বলছো একটু ঠিক করে বলো

গার্গী।। বাবা আগেও এইরকম করেছেন। আমি কি করবো? তুমি কি করছিলে? রাতে দরজা বন্ধ আছে কি নেই একবার দেখেছিলে

অমিত।। আমি ওই সময় ধ্যান করি

গার্গী।। তোমার এই সাধক দাদা হল একটা তেতো মাল।।

কিটি।। এইভাবে কথা বলবি না বৌদি

গার্গী।। ওর কি দরকার ছিল বিয়ে করার? আর তোমার বাবা সারাখন তোমার মায়ের স্মৃতি নিয়ে আছেন। মায়ের লেখা চিঠি মায়ের শাল মায়ের রুপোর গয়না মায়ের সিঁদুর কৌটো,মায়ের ওই ছবি রোজ মালা পড়ে। ঘরে মৃত মানুষের ছবি রাখতে নেই।

কিটি।। মানে? আমার মায়ের ছবি থাকবে না?

গার্গী।। ওনার তো মুক্তি হয় নি। উনি তোমার বাবা কে ছেড়ে যেতে পারেন নি। গয়ায় পিণ্ড....

কিটি।। পিণ্ড?

গার্গী।। বাবা ওই বানানো জগতে আছেন। যেখানে মা আছেন। এইটা একটা বিশ্রী কান্ড।

কিটি।। কিন্তু এখন বাবা কোথায়?

গার্গী।। আসলে 

কিটি।। আসলে কী?

গার্গী।। বাবা কাল সন্ধেতে বেরিয়ে গেছেন। রাতের খাবার খান নি। বাবা আর রাতে ফেরেন নি। আমি দরজা খুলে রাখলাম। যদি আসেন। চাবি নেন নি। আমি জেগেই ছিলাম। তুই যখন বেল দিলি ভাবলাম বাবা এলেন।

কিটি।। এখন  সব বলছ? কেন আগে  বলো নি?

গার্গী।। কারণ ওই লোকটার সব দায় আমি নিই। আমি ওনার ধরন জানি। বলে কি হবে.. আর একটু দেখে হাসপাতাল গুলো তে ফোন…থানায় খবর..

কিটি।। আচ্ছা বাবা কে ফোন করছ না কেন? আমি করছি। এইটাই মাথায় আসেনি

গার্গী।। উনি এইরকম উবে গেলে ফোন নিয়ে যান না

অমিত ছুটে আসে

অমিত।। এই যে বাবার মোবাইল। রেখে গেছে বালিশের তলায়। আমি ফোন করছি,বাজছে। কিন্তু কই সে ফোন! আমি শব্দ পাচ্ছি।শেষে বালিশের তলায়

কিটি।। তোমার বউ বলছে বাবা গতকাল সন্ধে থেকে নেই

অমিত।। এইতো বলল রাতে ফেরে নি

কিটি।। তুমি খবর নাও নি কেন দাদা?

অমিত।। ওরে বাবা ওই লোকের সঙ্গে কথা  কে বলবে? আমার সব সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস ধরে ফেলবে। কিন্তু ঐবদমাস বুড়োর পাগলামি নিয়ে বলতে গেলেই গেলো

গার্গী।। তার মানে তোমার সঙ্গে বাবার কোনো ঝামেলা হয়েছে গতকাল সকালে।

অমিত।। আরে ও বুড়ো আচমকা রেগে যায়। আমি ঐ মায়ের পিণ্ড দিতে গয়া যাবো বলতেই..

গার্গী।। উফফ

অমিত।। আর গার্গী আমাকে বলেছিল পিণ্ড দিতে

গার্গী।। সেটা আমি বলতাম। তুমি বললে কেন? সর্বনাশ করেছি তোমাকে বলে

অমিত।। আমি বলতে পারব না? পিন্ডি কে দেবে? তুমি না আমি?

গার্গী।। ঠিক । মা তোমাদের। আমি কে?

কিটি।। বাবা কে খোঁজো দাদা। পুলিশ হাসপাতাল এ খোঁজ নাও।

এইতো অর্ণব ফোন করেছে। হ্যালো। শোনো, বাবা বাড়ি থেকে চলে গেছে। নো ট্রেস। মোবাইল নিয়ে যায়নি। তুমি চলে এসো। আর আজকের ব্যাপারটা তো বাবা না থাকলে.... হ্যালো আরে তোমার বাবা মা এত অবুঝ কেন? আজ ই সব কথা বলতে হবে? কাল বললে কি হবে?

শোনো, সব হাসপাতালে এখনই খোঁজ নাও। বাবার ছবি আমি অ্যাপ এ পাঠাচ্ছি। রাখছি।

অমিত।। উফফ। বাবা আগেও দুবার...

কিটি।। আজ আমার বাবা কে দরকার....আজ

অমিত।। স্বার্থপর। অর্ণব আর তুই এখন বিয়ে করবি? সব দর্শন পাল্টে গেলো? যখন যা ইচ্ছে তাই? বাবা দু বার মাথা ফাটিয়ে ফিরেছে। তুই কি একবার এসেছিলি? আর আজই বাবা কে দরকার?

কিটি।। শোন দাদা আমি আসতে পারিনি। আমি বাইরে ছিলাম। অর্ণব টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিল।

অমিত।। কে তোর ওই অর্ণবের টাকা চেয়েছে? ওই টাকা আমি তো ফেরত দিয়ে দিয়েছি। ও বলেনি তোকে?

কিটি।। কই বলে নি তো

 অমিত।। বাঃ। এই লোফার টা কে বিয়ে করবি?.. লিভ ইন করেও চেতনা হলো না?

কিটি।। বাবা আমাকে সাপোর্ট করেছে। জেনে রেখো। হয়তো অর্ণব ভুলে গেছে। এখন দয়া করে পুলিশ এ ফোন করো

অমিত।। আমি থানায় ফোন করেছি। ওরা আসতে বলল। ছবি নিয়ে যাচ্ছি আমি...

দরজায় কমল ও একটি  অচেনা মেয়ে।

সবাই।। বাবা...!

কমল।। গার্গী মা আমাদের চা দাও। আর এই মেয়ে টিকে বাথরুম দেখিয়ে দাও। তোমার পুরোনো পোশাক কিছু ওকে দাও।

মেয়ে টি আচমকা কাঁদতে থাকে। কমলের হাতে একটি মালা। তার স্ত্রী এর ছবি থেকে পুরোনো মালা খুলে নতুন মালা টা পরিয়ে দেয়।

অমিত।। বাবা এ কে?

কমল।। এ সীতা।

সীতা কেঁদেই চলেছে। আলো কমে।

--- প্রথম দৃশ্য শেষ হয় ---