:: ১ ::
সময়ের ঘূর্ণিজালে সে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। পৃথিবীর শতকরা ৮৫ ভাগ জমি তখন কতিপয় ইওরোপীয় দেশের কবজায়। রুদ্ধশ্বাস বেগে প্রসারিত হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসন সীমানা। এহেন ঔপনিবেশিক পরিমণ্ডলে মৃত্যুযজ্ঞের আগুন জ্বেলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪-এ। ওই বছরেরই শেষের দিকে, পৌষ ১৩২১-এ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ‘লড়াইয়ের মূল’। ‘বাণিজ্য ও সাম্রাজ্যের গান্ধর্ব বিবাহে যে ঔপনিবেশিকতার জন্মোদয় তার অন্ত্যঅঙ্কে নাটমঞ্চে’ দেখা গেল মাছের বদলে ছড়িয়ে আছে রাশি রাশি রক্তাক্ত কাঁটা। ইওরোপের বাহিরে যখন প্রভুত্বের নীতি প্রচার হয় তার কটুত্ব ইওরোপ বোঝে না। এখন জতুগৃহদাহ ইওরোপেই— ‘আজ তাহা নিজের গায়ে বাজিতেছে’। মৃত্যুহীন সমীচীন বিশ্ব গড়ার প্রতিশ্রুতি থমকে গিয়েছে জার্মানিতে।
সকলেই জানেন, প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার চার বছরের মধ্যে থামলেও, জার্মানির পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তাল হয়। ক্রমশ জগৎবাসী সাক্ষী থাকবে ফ্রাঙ্কোর স্পেন, হিটলারের জার্মানি এবং মুসোলিনির সিংহদ্বার খোলা ইতালির। এহেন পরিস্থিতিতে ‘লিগ অফ নেশনস্’ ১৯৩২ সালে আহ্বান জানায় আলবার্ট আইনস্টাইনকে। তাঁকে বলা হয়, কোনো এক স্থিতপ্রজ্ঞ চিন্তককে বেছে নিতে যাঁর সঙ্গে রচিত হবে তাঁর বার্তালাপ। বিষয়ের অভিমুখ একটিই— যুদ্ধ কেন? আইনস্টাইন সংলাপ শুরু করেন সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সঙ্গে মহাবিজ্ঞানীর প্রশ্নের উত্তরে ফ্রয়েড বলেন যে কথাগুলি, তার যোগাযোগ সেই ইরস (‘Eros’) এবং থানাটস (‘Thanatos’)-এ।
আমাদের অনেকেরই মনে পড়বে, ১৯২০ সালে বেরিয়ে ছিল থানাটস নিয়ে ফ্রয়েডের সন্দর্ভ— ‘Beyond the Pleasure Principle’। এ-কথা কে না জানে, গ্রিক অনুষঙ্গে থানাটস-এর সরাসরি যোগাযোগ মৃত্যুর সঙ্গে। আর ইরস এমন বিষয় যেখানে জীবনের জরাজীর্ণ ডালে ফুটে ওঠে কবিতার মুখ। ফ্রয়েডের সেই ১৯৩৩-এর চিঠিতেই ছিল— Love, Emotion, Compassion এই শব্দগুলি। ইরস-এর সঙ্গে জুড়ে আছে প্রেম, প্রণয়ের মতো শব্দাবলি।
:: ২ ::
‘বাকি ইতিহাস’ নাটকের রচয়িতা বাদল সরকারকে অনুসরণ করে বলা যায়, প্রেম প্রণয় প্রভৃতি শব্দ উচ্চারিত হলেই অদৃশ্যে দেখা যায় রজ্জুবন্ধনী। এই জগৎসংসারে ‘প্রণয়’ নামক মানবিক অমৃতপ্রবালের কথা উঠলেই এসে পড়ে নির্ধারণবাদী (Deterministic) অজস্র নিয়মাবলি। কালের মাত্রা কিংবা হৃদয়-সংবাদের কণ্ঠরোধে রাষ্ট্রশক্তি চিরদিনই পেতে রেখেছে নানা বিন্যাসে বন্ধন-জাল। ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, বয়স ইত্যাদি অন্তহীন বাধা।
বিশ্বজুড়ে আগুন নিয়ে খেলার এই মুহূর্তে শরদিন্দু-সীতানাথ, বাসন্তী-কণা, বিজয়— এরা যেন সরাসরি করমর্দন করছে আমাদের সঙ্গে। এই বাস্তবতাকে বুঝেছেন ‘বাকি ইতিহাস’-এর সাম্প্রতিক প্রযোজনার নির্দেশক সুরঞ্জনা দাশগুপ্ত এবং উপস্থাপক নির্বাক অভিনয় অ্যাকাডেমি। সীতানাথ চক্রবর্তী যখন শরদিন্দু নাগকে বলে, জীবনের অর্থ ফুরোলে ভাবে – এক দিন অর্থ ফিরবে। বেঁচে থাকা শেষ হলে ভাবে – এক দিন আবার শুরু হবে। তাদের আশা আছে। সুদূর অতীত থেকে শোনা যায়, এ-জন্মে জানি না তবু আর-জন্মে আনন্দে ছিলাম। এই বিগত জন্মের আশ্বাস যাদের করতলবৎ, তারা উচ্চস্বরে বলতে পারেন— বউদি এক বালতি চা বানান। বাসন্তী ও শরদিন্দুর সঙ্গে সীতানাথ চক্রবর্তীর বোটানিক্যাল গার্ডেনে আলাপ হয়েছিল না হয়নি, এই বিষয়টা গুরুতর কিছু নয়। এই প্রতিবেদককে বাদল সরকার বলেন— কার্যকারণে গঠিত নাট্যের আখ্যানভাগে যে দর্শক অভ্যস্ত তার জন্য একরকম বুড়িছোঁয়া।
রবিবারের সকালে শরদিন্দু নাগ ও তার স্ত্রী বাসন্তী ব্যতিব্যস্ত হাজারো কাজে। হোক না ছুটির দিন, বাসন্তীর হাতে রয়েছে গৃহকোণ সাজানো, মশারি কাচা, রান্নাবান্না ইত্যাদির সঙ্গে গল্প রচনারও ফরমায়েশ। বাসন্তী সাময়িক পত্রের লেখিকা। গল্প পাঠাতে হবে শীঘ্র। সেই সুবাদে সীতানাথ চক্রবর্তী ও কণার দাম্পত্য জীবনের কাহিনি নির্মিত হয় তার হাতে। কণার মদ্যপ, জুয়াড়ি বাবার হাত থেকে কণাকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত সীতানাথ। কণা জানে, গড়িয়ার কাছে রয়েছে তাদের জমি যেখানে সীতানাথ গড়ে তুলবে নিশ্চিত আশ্রয়ের এতটুকু বাসা। কণার বাবা মারা গেছে হাসপাতালে আগুন লেগে। তার মেজ দিদি পা বাড়িয়েছে ভিন্ন উপায়ে জীবনযাত্রায়। সে পথ সমাজ অনুমোদিত নয়। কণা আশ্বস্ত তার সামনে প্রসারিত ভবিষ্যৎ নিয়ে— যার প্রতীক গড়িয়ার ওই ভূমিখণ্ড।
অর্থসংকটে সীতানাথকে জমি বন্ধক রাখতে হয় এবং কোর্টের বেলিফ এসে কণার সামনেই জানিয়ে যায় সেই মর্মান্তিক বৃত্তান্ত। অন্যদিকে কণার বাবা যে জীবিত আছে এবং প্রতি মুহূর্তে সীতানাথকে শোষণ করছে এই বিষয়কে আচ্ছাদিত করার মরণপণ চেষ্টা সীতানাথের। কিন্তু জমি-ব্যাঙ্কের টাকা সব খুইয়েও আদালতের হস্তক্ষেপে সবই প্রকাশ্যে আসে। এর পরেই কণা জানিয়ে দেয়, তার মেজদি যে পথে গেছে, ওই পথই সত্যি। সীতানাথ নামক আশ্বাসের দ্বীপভূমিকে আঁকড়ে থাকা নিতান্তই বৃথা। বাসন্তী তার গল্প শরদিন্দুকে পড়ে শোনায়। কণা চলে যাওয়ার পর রান্না ঘরের কোণে পড়ে থাকা কুণ্ডলী পাকানো দড়িটা সীতানাথ হাতে তুলে নেয়। মাথার ওপর সিলিংএ লাগানো লোহার হুকের দিকে তাকিয়ে থাকে সীতানাথ। বাসন্তীর গল্পের এখানেই সমাপ্তি। সকালের সংবাদপত্রে উদ্বন্ধনে আত্মহত্যার বাস্তবকে গল্পের পটভূমিতে এভাবেই মিলিয়ে দেয় বাসন্তী।
বাসন্তীর চরিত্রে সুরঞ্জনা দাশগুপ্তের অভিনয় অত্যন্ত অর্থবহ। অভিনয়কলাকে দু’ভাবে প্রয়োগ করেছেন এই প্রযোজনার নির্দেশক তথা বাসন্তী চরিত্রের অভিনেত্রী। তিনি কখনও বাসন্তী হয়ে উঠেছেন, কখনও যেন অবলোকন করেছেন বাসন্তী নামক বাদল সরকারের চরিত্রটিকে। সংলাপগুলোকে সহজ কাঠামো দিয়ে প্রাণবন্তও করেছেন। বাসন্তী যখন তার অধ্যাপক স্বামী শরদিন্দু নাগকে বোঝায় তার নিজের লেখা গল্পের প্রেক্ষাপট, সেই অংশটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পরেই বাসন্তী প্রণোদিত করে শরদিন্দুকে তার নিজস্ব ভাষ্য নির্মাণে। শরদিন্দু চরিত্রে পদ্মনাভ দাশগুপ্ত সঙ্গত করেছেন চমৎকার। এই নাটকের আখ্যানভাগ খুবই সহজ। একবার বাসন্তী রচনা করে এক গল্পকথা। দ্বিতীয়বার তার বাংলার অধ্যাপক স্বামী পুনরায় রচনা করবে কণা ও সীতানাথের গল্প। শরদিন্দুর কলম থেকেই ঘটবে অগ্ন্যুৎপাত।
সীতানাথ কণা গ্রীষ্মাবকাশে বেড়াতে যায় চম্বলগড় জঙ্গলে। সেখানেই পার্বতী নামক বালিকা বা কিশোরীর সঙ্গে কলকাতা থেকে আগত এই দম্পতির আলাপ পরিচয়। ভিড় থেকে সরে আসা প্রবাসী আকাশে দূরে পাহাড়চূড়া দেখা যায় আর সেই অরণ্যেই এক দুর্বিষহ রহস্যের পাশে সীতানাথকে দাঁড়াতে হয় একা। পার্বতীর সঙ্গে সীতানাথের সম্পর্কে কোথাও কোনও দোষ দেখে না বাসন্তী। হঠাৎই সীতানাথ বেশ কয়েক ঘা চড় থাপ্পড় কসিয়ে দেয় পার্বতীর গালে। এর পর পার্বতীর অরণ্যে পলায়ন। আর সেই দুঃসহ মহানিশিতে ম্লান হয়ে যায় সব আলো। নির্যাতিতা পার্বতী হয়ে গিয়েছিল মূক বধিরের মতো। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে আহত সীতানাথকে দেখে। এই ঘটনাকে কেন্দ্রে রেখে এক পূর্বাপর আখ্যান গড়েছেন বাদল সরকার।
পুর্বকথা এই যে, হাইস্কুলের উজ্জ্বল ছাত্র অশোক সান্যাল ক্লাস চলাকালীন অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে পড়ে চলে ভ্লাদিমির নবোকভের উপন্যাস ‘লোলিতা’। স্কুলের প্রধান শিক্ষক সীতানাথ চক্রবর্তী হাতেনাতে ধরে ফেলে ছাত্রের এই ‘দুষ্কর্ম’। অবিমৃষ্যকারি এই আচরণের মাশুল দিতে স্কুল থেকে বিতাড়িত হয় অশোক। হেডমাস্টার সীতানাথের কাছে ছুটে আসে তার প্রাক্তন অধ্যাপক তথা বর্তমানে স্কুল পরিচালন কমিটির সম্পাদক বিধুবাবু। তার অনুরোধ, এই শাস্তি থেকে অশোকের অব্যহতি। নিজের সিদ্ধান্তে অনড় অটল হেডমাস্টার সীতানাথ। এরই মধ্যে কণা এবং সীতানাথের গভীর বন্ধু বিজয়ের কথোপকথন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই প্রযোজনার অত্যন্ত গুরুত্বের এই মুহূর্তগুলি খুবই সফল হয়েছে কণার চরিত্রে মৌলি রায়ের বিবিধ অভিব্যক্তির বিন্যাসে।
এই অংশেই বোধহয় মৌলি রায় চমৎকৃত করেছেন সকলকে। বিজয় চরিত্রের অভিনেতাও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। পারিবারিক বন্ধু বিজয়কে কণা জানায় চম্বলগড়ের যাবতীয় ঘটনাবলি এবং তার পরবর্তী সময়ে সীতানাথের সঙ্গে কণার যাবতীয় অন্তরঙ্গতার অবসানের কথাও। ক্রমশ বিজয় জানতে পারে, সীতানাথ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ছাড় দিচ্ছে অশোককে। বিধুবাবুর নাতনি গৌরির মধ্যে চম্বলগড়ের পার্বতীর পুনরাগমন। এই পর্যন্ত গল্প আসার পর বাসন্তী ঘুমোতে যায়। নাটক রচয়িতা বাদল সরকারও উপস্থিত হন মঞ্চে।
গল্পের মধ্যে গল্পের যে উন্মোচন তিনি ঘটিয়েছেন এবার বাস্তব এবং সাহিত্যের দ্বৈরথে দাঁড়াতে হবে তো তাঁকেই!কিংবদন্তি নাট্য নির্দেশক সত্যদেব দুবে এই প্রতিবেদককে যে সূত্রে বলেছিলেন, ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকে লেখকও বাদলবাবু ইন্দ্রজিৎও বাদলবাবু, সেই সূত্র অনুসরণ করে আমরা বলতে পারি, গল্পের পাতা থেকে সরাসরি উপস্থিত হয়েছে সীতানাথ চক্রবর্তী।
গল্পকার শরদিন্দু নাগের পিঠে পিঠ দিয়ে সে লড়াই করে। এ তো নাটককারের নিজেরই অন্তর্দ্বন্দ্ব। খাতায় সাঁটা আছে ছবি— দুঃশাসনের বুক চিরে রক্তপান করছে ভীম; ফারাওয়ের ক্রীতদাসরা পাথর টেনে তুলছে পিরামিডের জন্য, তাদের পিঠে পড়ছে চাবুক। রোমের কলোসিয়ামে সিংহের মুখে ফেলা হচ্ছে জীবন্ত মানুষকে। জোয়ান অফ আর্ককে আগুনে পোড়ানো হচ্ছে। শিকলে বাঁধা ক্রীতদাস; হিটলারের কনসান্ট্রেশন ক্যাম্প; স্পেনের গৃহযুদ্ধ; জালিয়ানওয়ালা বাগ; হিরোশিমা-নাগাসাকি— সবটা জুড়েই লেখা রয়েছে বাকি ইতিহাস।
গল্পের চরিত্র সীতানাথ বাসন্তীর লেখায় এবং শরদিন্দুর লেখায় আত্মহত্যা করেছে দু’বার। তবুও সে বলার ক্ষীণ চেষ্টা করে— মানুষের ইতিহাস জীবনের ইতিহাস। গর্জে ওঠে শরদিন্দু— মিথ্যে কথা, এ মৃত্যুর ইতিহাস। আমাদের মনে পড়বে, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মহাযুদ্ধকালীন সময়ে আইনস্টাইনের চিঠির উত্তরে তাঁরই ইরস ও থানাটস-কে স্পর্শ করা কিছু কথা। যদি প্রেমের পদে পদে শতসহস্র বেড়ি পরানো থাকে তবে বাকি ইতিহাস যা হয় তা তো থানাটস-এরই ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বছর (১৯৩৯), রবীন্দ্রনাথ লিখছেন— ‘অন্ধবেগে ঝঞ্ঝাবায়ু হুঙ্কারিয়া আসে,/ ধ্বংস করে সভ্যতার চূড়া’। এই ‘আহ্বান’ কবিতার শেষেই তাঁর নিবেদন— ‘বলীর পদে দুর্বলেরে কোরো না বলিদান’। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার— এই যদি মানুষের ললাটলিখন হয় তবে তো বাদলবাবুকে বলতেই হবে, মৃত্যুর ইতিহাসই বাকি ইতিহাস। তখনই তূর্যনিনাদ —
শরদিন্দু : তুমি আত্মহত্যা করলে কেন সীতানাথ?
সীতানাথ : তুমি আত্মহত্যা করোনি কেন শরদিন্দু?
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে রঙ্গমায়া বা মঞ্চমায়া আদতে ‘a series of magical moments’। যদি ‘লোলিতা’ paedophilia-র কাহিনি হয় তাহলে ক্ষতবিক্ষত সীতানাথকে দেখে স্তব্ধ হয়ে আসা পার্বতীর জীবিত থাকার যাবতীয় চিহ্ন কোন স্ফুলিঙ্গের ছোঁয়ায় প্রত্যাবর্তিত হয়? সীতানাথ তার নিকট বন্ধু বিজয়কে বলেছিল, তার সর্বাঙ্গে প্রবেশ করেছে বিষাক্ত জীবাণু। আসলে নাটকের লেখকও নিজেও হাজারো প্রশ্নে বিদ্ধ। যদি বিকৃতির জীবাণু গ্রাস করে থাকে সীতানাথকে তবে ‘বিরস দিন বিরল কাজ প্রবল বিদ্রোহে’-র মধ্যেই মহাসমারোহে যে প্রেমের আগমন হয় সেই সুন্দরের অভ্যর্থনা করা হবে কোন মন্ত্রে, কোন গানে?
প্রণয় যদি শত শত সামাজিক যুক্তিতে ধিকৃত হয় তাহলে মানুষের ইতিহাস অবধারিতভাবে রক্তবন্যার ইতিহাস— সেই বাকি ইতিহাসের প্রশ্নকেই গল্পের চরিত্র সীতানাথ গল্পকারের চোখে চোখ রেখে সরাসরি নিক্ষেপ করে। পৃথিবীতে আজও যত প্রেমের আখ্যান লেখা হয়েছে তার মধ্যে কটাই বা সমাজ-অনুমোদিত? শিশুদের মুখে চুষিকাঠি গুঁজে দেওয়ার মতো শান্তশিষ্ট প্রেমের কাহিনির কটা উদাহরণ মিলবে? শিশু নির্যাতনের প্রশ্ন স্বতন্ত্র ও ঘৃণ্য, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে কাল ও পরিসর ভেদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রণয় সম্পর্ককেও নিন্দনীয় বলতে কসুর করেছে কি মানব সভ্যতা! বাদল সরকার বলতেন, এক অপরিণত অবিকশিত সভ্যতার মানুষ আমরা। প্রণয়ের ক্ষেত্রে হাজারো বাধা-নিষেধ, প্রণয়-সম্পর্কে আবদ্ধ্রাও ভয় পেয়ে যান। অন্যদিকে হিংসার বিরাম নেই।
নির্বাক অভিনয় অ্যাকাডেমির ‘বাকি ইতিহাস’ প্রযোজনার সবচেয়ে বড় সাফল্য, এই নাটকের প্রাণবস্তুকে স্পর্শ করতে অত্যন্ত সফল হয়েছেন নির্দেশক সুরঞ্জনা দাশগুপ্ত। মঞ্চ নির্মাণে minimalism-এর স্পষ্টটা বাদল সরকারের নাট্যচিন্তাকে মনে করিয়ে দেয়। সীতানাথ চরিত্রের অভিনেতা অনির্বাণ দাশ বেশ উঁচু মাপের অভিনয় করলেও তাঁর কাছে বিনীত নিবেদন— ‘আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছিলাম তুমি কেন আত্মহত্যা করোনি, তুমি জবাব দিতে পারলে না’ বা ‘তুমি আত্মহত্যা করোনি কেন শরদিন্দু’— এই সংলাপগুলোকে আর-একটু তীক্ষ্ণ ধারালো তর্জনের মাত্রায় উন্নীত করুন। বিধুবাবু, বিজয়, বাসুদেব সহ প্রত্যেক চরিত্রের অভিনেতারাই যুক্তিপূর্ণ অভিনয় করেছেন।
গোটা ভারতবর্ষ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে নাটক ‘বাকি ইতিহাস’। এই নাটকের মঞ্চায়ন বিষয়ে পৃথক এক আলেখ্য রচনা করা যায়। সে তুলনায় কলকাতায় বাদল সরকারের নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে সংখ্যায় যথেষ্ট কম। সেদিক থেকে ভাবলেও নির্বাক অভিনয় অ্যাকাডেমি এবং সুরঞ্জনা দাশগুপ্তের এই উদ্যোগের প্রতি বাংলাভাষী নাট্যামোদী সব মানুষ চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ রইলেন। প্রযোজনা নিয়ন্ত্রণকারী তথা নির্বাক অভিনয় অ্যাকাডেমির বিশেষ সংগঠক ব্যক্তিত্ব, প্রখ্যাত অভিনেতা-পরিচালক মূকাভিনয় শিল্পী অঞ্জন দেবও আমাদের অশেষ ধন্যবাদার্হ। এই প্রযোজনার উপদেষ্টা হিসেবে বর্ষীয়ান নট-নির্দেশক অশোক মুখোপাধ্যায়ের নাম যুক্ত করে প্রযোজক সংস্থা এবং নির্দেশক সুরঞ্জনা দাশগুপ্ত স্পষ্ট করেছেন উচ্চমানের থিয়েটারের প্রতি তাঁদের সুসংবদ্ধ অঙ্গীকার।