সুদীপ সান্যাল আলোর মানুষ। বর্তমানে থিয়েটারের যাঁরা যুক্ত, তাঁরা সকলেই নেপথ্যের মানুষ হিসেবে সুদীপ সান্যালের নাম জানেন। নিজের কাজ এবং তাঁর স্যর তাপস সেনের কাছে কাজ শেখার ব্যাপারে তিনি কথা বললেন TOTZINE_এর সঙ্গে।
আলোর কাজ আমি একেবারেই অ্যাক্সিডেন্টালি শুরু করেছি। আমি ফিজিক্সের ছাত্র, তার সঙ্গে থিয়েটারের একটা ইন্টারেস্ট ছিল। পাড়ায় কিছু বন্ধুবান্ধব ছিল, কিছু দাদা ছিল, তাদের নিয়ে কাজ শুরু করা গেল। তখন কিন্তু অভিনেতা হওয়ার কথাই ভেবেছিলাম। অন্য কিছু নয়। আমাদের তখন ছোট্ট একটা দল। প্রচুর রিহার্সাল করে শো করার চেষ্টা করলাম। আর করতে গিয়ে বুঝলাম যে কিছুই হচ্ছে না। এটা আমি বলছি, ওই ১৯৯২-৯৩ সালের কথা। তখন বিভিন্ন জায়গায় নাটকের প্রতিযোগিতা হতো। আমরা ওই রকম অনেকগুলো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা গেল।
আমরা সেখানে গিয়ে যথারীতি লাস্ট হতাম। হওয়ারই কথা, কারণ, আমরা তো স্টেজ, আলো এগুলো কিছুই জানতাম না। প্রপার একজন লাইট ডিজাইনার সেট ডিজাইনার বা মেক আপ আর্টিস্টকে দিয়ে কাজ করানো মুশকিল। টাকা নেই কিছু নেই। তখন আমরা নিজেরাই কিছু কিছু কাজ শেখার কথা ভাবলাম। সেই থেকেই আমার আলোর কাজটা প্রথম শেখা। এখানে কথা হল যে, থিয়েটারটা ভালো করে শেখার আগ্রহটা কিন্তু আমার প্রথম থেকেই ছিল। আমি পরে সংলাপ কলকাতা বলে একটা দলের সঙ্গে যুক্ত হই। কুন্তলদার নেতৃত্বে কয়েকটা নাটকে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয়ও করেছি। করতে করতে আমি দুটো ব্যাপার বুঝতে পারি।
প্রথমত, থিয়েটার লাইটিংয়ের ওপর আগ্রহটা বাড়তে থাকে। কারণ, তখন আমি রীতিমতো থিয়েটার দেখাটা শুরু করেছি। বিভাসবাবু, রুদ্রবাবু, আশোকবাবুর ঊষাদির কাজ দেখতে শুরু করেছি। এঁদের মধ্যে ঊষাদি বিশেষ করে আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিলেন। তো এঁদের নাটকের আলোর কাজটা আমি দেখতে শুরু করি। আর দ্বিতীয়ত, কিছুদিন অভিনয় করার পরেই আমি বুঝে যাই যে, আমি একটা অত্যন্ত খাজা অভিনেতা। এই রিয়ালাইজেশনটা আমার খুব অল্পবয়সে হয়ে গিয়েছিল, থ্যাঙ্ক গড! আমি বুঝতে পেরেছিলাম, যে অনুভবটা ভেতরে আসছে, সেটা আমি প্রকাশ করতে পারছি না।
অ্যাক্টর হিসেবে আমার যে টুলগুলো যেমন, ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন থেকে কণ্ঠস্বর কিছুতেই সেই ব্যাপারটা ঠিকঠাক ধরা দিচ্ছে না। আমি বুঝেছিলাম যে, অভিনেতা হিসেবে আমি খুবই কাঁচা। অন্যদিকে আলোর প্রতি আগ্রহটা বাড়তে থাকল। কারণ, আমি ফিজিক্সের ছাত্র। আলো, ইলেক্ট্রিসিটি এসব নিয়ে আমার একটা বেসিক আগ্রহ তো ছিলই।
থিয়েটারে আমার অন্য কোনও এক্সপোজার ছিল না। শুধু নাটক দেখা ছাড়া, আমি আর কিছুই জানতাম না। তো এই করতে করতে আমার মনে হল, যে, তাহলে আমি আলোর কাজটা একটু মন দিয়ে শেখার অন্তত চেষ্টা করি। কিন্তু কীভাবে শিখব? সেই সময় নান্দীকারের অশোক প্রামাণিকের সূত্রে আমার সঙ্গে আলাপ হয় বাদল সরকারের। অশোকদাকে আমি চিনতাম। বাদলদার কাছেই আমি আলোর কাজ প্রথম শুরু করি।
তারপরে আমার মনে হয়, বাংলা থিয়েটারের আলোর ইতিহাসটা কীভাবে জানা যায়? যে কোনও কাজ করার আগেই তার ইতিহাসটা তো একটু জানা দরকার। তখন ইন্টারনেট ছিল না। তবু কিছু বই-পত্র সংগ্রহ করে পড়া সম্ভব ছিল। কিন্তু বই যা ছিল, সবই বিদেশী। বাংলা মঞ্চের আলোর ইতিহাস নিয়ে কোনও বই নেই। তখন আমরা একটা পত্রিকা বের করতাম। সেই পত্রিকার জন্য আমি রুদ্রবাবুর একটা ইন্টারভিউ করেছিলাম। ইন্টারভিউ করতে গিয়ে আমি রুদ্রবাবুকে বলি যে, আমি এই বাংলা থিয়েটারে আলোর বিষয়টা একটু ভালো করে জানতে চাই। তখন আমি বাদলবাববু সঙ্গে কাজ করতাম বলে থিয়োটার মহলে বেশ একটা পরিচিতি তৈরি হয়ে গিয়েছে। শাঁওলীদির সঙ্গে আলাপ হয়ে গিয়েছে, রমাদা মানে রমাপ্রসাদ বণিকের সঙ্গে আলাপ হয়ে গিয়েছে। সলিলবাবুর সঙ্গেও আলাপ হয়ে গিয়েছে। তো আমি রুদ্রবাবুকে যখন বলি যে আমি আলোর এই বিষয়টা জানতে চাই, তখন উনি বলেন যে, তাহলে তুমি তাপসদাকে জিজ্ঞেস করে নাও।
এবার, তাপস সেন তো একজন লেজেন্ড। তাঁকে ওইভাবে অ্যাপ্রোচ কার যায় নাকি? আমি রুদ্রবাবুকে বললাম যে, আমি তো ওঁকে চিনি না, আর কেনই বা উনি আমাকে কিছু বলবেন? উনি বললেন যে, উনি বলে দেবেন তাপসবাবুকে। তো ওইভাবে তাপস সেনের সঙ্গে আমার একটা আলাপ হয়।! স্যরের কাছে এমনি এমনি তো যাওয়া উচিত নয়, তাই আমি একটু হোমওয়র্ক করেই যাবো বলে ঠিক করেছিলাম। ভবলাম যে অন্তত একটা প্রশ্নপত্র তৈরি করি। খুব খেটেখুটেই প্রশ্নপত্রটা তৈরি করেছিলাম। আমি সলিলবাবুর কাছে বারবার গিয়ে প্রশ্নপত্রটা দেখাতাম। এইভাবে আট দশবারের চেষ্টায় সেটা একটা খাড়া করা গেল।
তখন অনুষ্টুপ পত্রিকার অতিথি সম্পাদক ছিলেন কুন্তলদা। থিয়েটার নিয়ে ওরা একটা সংখ্যা করছিল। মানে ওই সংলাপ নাট্যদলের কুন্তল মুখোপাধ্যায়। তো উনি আমায় বললেন, তাপস সেনের ইন্টারভিউটা করলে উনি অনুষ্টুপে ওটা প্রকাশ করতে চান। তা ভালোই হল। আমি দুদিন গিয়ে ইন্টারভিউটা করলাম। প্রায় চার ঘণ্টার ইন্টারভিউ। তখন তো টেপরেকর্ডার ছিল! আমার কাছে ক্যাসেটটা আর নেই। ওটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু অনুষ্টুপ পত্রিকায় বেশ বড় করে ওটা বেরিয়েছিল। প্রায় চল্লিশ পাতার ইন্টারভিউ। অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। শুধু থিয়েটার নয়, রাজনীতি, সামাজিক পরিসর নিয়েও কথা হয়েছিল। তাছাড়া উনি কীভাবে আলোকে দেখছেন। একটা প্রযোজনা শূন্য থেকে কীভাবে আলোকিত হয়ে উঠছে, উনি কীভাবে ব্যাপারটা দেখছেন, সেটার প্রসেসটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ওঁর কথাটা সবটা যে বুঝেছি তা নয়। পরে যখন আমি আরো ম্যাচিওরড হই তখন আমি কিছু কিছু বুঝেছি যে, উনি ঠিক কী বলতে চেয়েছিলেন। উনি মারা যাওয়ার পরে ইন্টারভিউটা আমি একদিন পড়ছিলাম। ওই তখন ২০১০ সাল নাগাদ। পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়, যে খুব কাঁচা প্রশ্ন হয়েছে। তবু সেগুলো ধরেই উনি এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যেটা আমি পরে বুঝেছি কতটা গুরুত্বপূর্ণ!
তাপস সেন আলো জিনিসটা একেবারে অন্যরকম করে দেখতেন। ধরুন নান্দীকারের বাপ্পাদিত্য হচ্ছে, সোহিনীর একক অভিনয়। তখন স্যরের শরীরটা বেশ খারাপ, আর কানে তখন খুব কম শুনতে পান। আমরা আলোটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করলাম। তারপর উনি স্ক্রিপ্টটা নিয়ে বাড়ি চলে গেলেন। পরদিন এসে, সৌমিক সেট করেছিল ওকে বললেন মাউন্ট বোর্ড দিয়ে তিনটে পাহাড় কাটতে। একবার কাটা হল, স্যরের পছন্দ হল না। উনি তখন কাঁপা কাঁপা হাতে একটা স্কেচ করে দিলেন। তারপর স্যর ঠিক যেমন ভাবে বললেন সেইভাবে আমরা আলোগুলো প্লেস করলাম।
যখন দেখলাম তখন মনে হচ্ছে যে, একটা দূরে পাহাড়, আবার একটা একটু কাছে। অদ্ভূত এমন একটা আলো আঁধারি তৈরি হল যে, নাটকের আবহটাই পুরো পাল্টে গেল। সেট আলো এগুলো ইন্টিগ্রাল। স্যর বলতেন, ‘মানুষ যখন দেখে, তখন তারা আলাদা করে দেখেও না, আলাদা করে শোনেও না। সমস্ত দেখাশোনাটা একসঙ্গে ঘটে, অনুভূতির স্তরে গিয়ে সেটার একটা বিস্তার হয়।’ উনি কী করেছিলেন, ব্যাকড্রপে একটা সাদা পর্দা ছিল, সেটার সামনে ওই ছোট ছোট পাহাড়গুলো বসিয়ে, তার পিছনে একাধিক আলো দিয়ে উনি এমন একটা জিনিস তৈরি করলেন, যে ওই পাহাড়ের আবহটা তৈরি হল। উনি বললেন, ‘গল্পটা আমি ছোটবেলায় পড়েছিলাম, অত মনে ছিল না। কাল বাড়ি গিয়ে পড়ে দেখলাম যে, আরে, এ তো ত্রিকূট পাহাড়।’ তাই বলব, আলোই বলি বা যাই বলি, ভাবনাটা যখন শুরু হয় কিন্তু সাহিত্যের স্তরে। আমিও পরে কাজ করতে গিয়ে বারবার এটাই দেখেছি।
বড় সাহিত্যিক যাঁরা, তাঁদের তো আর সব কথা ওইভাবে খুলে লেখার দরকার হয় না! কিন্তু আমরা পরে যখন পড়ি, তখন ওই চিন্তাগুলোকে তাঁরা আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারেন। থিয়েটার লাইটিং করতে গিয়ে আমি স্যরের কাছে এবং পরে অন্য অনেকের কাছেই যেটা শিখেছি, সেটা হল, একটা এমন অনুভূতি যেটাকে থিয়েটারে ভাষা, অভিনয়, সেট কোনোটা দিয়েই ঠিক ধরা যাচ্ছে না, সেটাকে যদি আলো দিয়েও ধরা না যায়, তাহলে স্যর মনে করতেন যে, আলোর কাজটা ঠিকমতো হল না। স্যর বলতেন ওটাই টেক অফ পয়েন্ট। স্যরের আলোর বিশেষত্বই হল, আলোটা সব সময় খুব ড্রামাটিক।
স্যরের কাজ নিয়ে কথা বলতে গেলেই এটা বলতে হয়, যে স্যর স্টেজের ওপর ট্রেন চলার অনুভূতি দিতে পেরেছেন। জলের অনুভূতি দিতে পেরেছেন। এ নিয়ে অনেক আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু আমার স্যরের কাজ সম্বন্ধে যে কথাটা বিশেষভাবে বলতে ইচ্ছে করে সেটা হল, উনি যেভাবে থিয়েটারের একটা সিনের মুডকে এনহ্যান্স করতে পারতেন সেটা সত্যিই আশ্চর্য!
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আলো আর রঙের একটা ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু সেটা শুধু বিজ্ঞানের স্তরেরই ব্যাখ্যা। তার বাইরে গিয়েও তো রঙ আর আলোর একটা এফেক্ট আছে মানুষের মনে! এই যেমন বিকেলের আলো, শীতকালের মরা আলো, এই যে অজস্র আলো, সেগুলোর আমাদের সাইকোলজিক্যাল স্পেসে একটা আলাদা অনুভব আছে তো? সেটা স্যর ধরতে পারতেন। সাবলীলভাবে, শিল্পী হিসেবে পারতেন। সেটা খুব কম লোকেই পারে।
আলোর কাজ নিয়ে আরো কথা বাকি থেকে গেল। বাকিটা থাকবে আমাদের পরবর্তী সংখ্যায়