আলোর ব্যাপার আমি তেমন কিছু বুঝিনা, ফলে আলোক শিল্পী হিসেবে তাপস সেনের গুরুত্ব কতখানি তা বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতা আমার নেই। আর একটা কথাও এই সূত্রে বলতে হবে। একেবারে ছোটবেলা থেকে বহুরূপীতে থাকার সুবাদে, এবং তাঁর ছেলে জয় আর মেয়ে জয়ন্তীর সঙ্গে পরিচিতির সুবাদে তাপস সেন আমার কাছে খুব সুদুরের মানুষ ছিলেন না। থিয়েটার সম্পর্কে স্কুল জীবন থেকেই প্রবল আগ্রহ ছিল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যখন পড়ি, জয়ন্তী ছিল অন্য বিভাগে। ক্লাস না থাকলে আমরা দুজনে বসে বিশেষ করে তাপস সেন এবং অন্য নাট্য জনদের নিয়ে কথা বলতাম। এতটাই নিবিষ্ট ছিল আমাদের আলাপ যে আমার সঙ্গে জয়ন্তীর সম্পর্ক নিয়ে বেশ একটা কানাকানি শুরু হয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়াও বহুরূপীর নাটক দেখতে এসেছেন তাপস সেন, সামনে থেকে দেখেছি। মানুষটির কোন ভাও ছিল না তো।
গ্রীন রুমে মেকআপ করছেন শক্তি সেন, তাঁকে বললেন, 'কিরে শক্তি এখনো লোকের গালে চড় মেরে টাকা রোজগার করিস?' মেকআপ করতে গেলে মুখে মাখা রং থাবড়ে থাবড়ে মেশাতে হয়, তাকেই বলা হচ্ছে গালে চড় মারা। এই সহজ মানুষটিকে আমি দেখেছি, ফলে যখন সন্দর্ভের যযাতীয় নাটকে তাপস সেনকে দিয়ে আলো করানো সাব্যস্ত হল তখন আমার যে খুব টেনশন হয়েছিল এমন নয়। তাঁকে গিয়ে বললাম, রাজি হলেন, এবং বললেন, আমি কিন্তু প্রফেশনাল। আমাকে যাতায়াতের ট্যাক্সি ভাড়া দিতে হবে, নিজের গাড়িতে যদি যাই তাহলে পেট্রোলের খরচ দিতে হবে। সে তো বলাই বাহুল্য। তাহলে আর কি, তাপস সেন আলো করবেন আমাদের মত এলেবেলে দলের নাটকে।
কিন্তু একটা ব্যাপারে খুব ঝামেলায় পড়েছিলাম। এই নাটকের মঞ্চ পরিকল্পনা ছিল রনজিত চক্রবর্তী। রনজিতদা একসময় অনেক নাটকের সেট করতেন। অন্য থিয়েটারের সদস্য ছিলেন, এখন শুনেছি খুব জবুথবু হয়ে গেছেন, বাড়িতেই থাকেন। রনজিতদা যে সেটটা করেছিল-- পেছন দিকে দাবার ছকের মত পুরোটা সাদা কালো সাদা কালো চৌখুপি কাটা স্টেজ। রিহার্সালে এসে তাপস সেন বেশ অসন্তুষ্ট হলেন। 'এত সাদা পেছনে, আমাকে বলনি কেন? আলো তো বাউন্স করবে। সামনের চরিত্রগুলোকে ভালো করে দেখাই যাবে না।' নিশ্চয়ই এই কথাগুলো তিনি আরও কাউকে কাউকে বলেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন বিভাস চক্রবর্তী। তিনি আমাকে প্রভূত বকলেন, কোন্ মাপের মানুষ কিছুই জানো না, তাপস দার কাছে চলে গেছ। নিজেকে আগে তাপস সেনকে দিয়ে আলো করাবার যোগ্য হয়ে ওঠো তারপর তাঁকে নিয়ে ভাববে।
এই ঝাড়টা খাওয়ার পর পরের নাটকে আবার তাপস সেন, নাটকের নাম বিজড়িত। স্টেজ রিহার্সাল চলছে, তাপস সেন যথারীতি মাথা ঝুঁকিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আছেন। যাঁরা থিয়েটারের লোক তারা জানেন, এইটা তাঁর ধরন ছিল। রিহার্সাল দেখতেন মাথা নিচু করে, যেমন করে মানুষ ঢোলে আর কি। পরে অবশ্য তাঁর শিষ্যদের একজনের কাছ থেকে জেনেছি, তিনি মন দিয়ে সংলাপ শুনতেন, সংলাপের আওয়াজ শুনতেন, এবং মনে মনে ছবি তৈরি করতেন। যাই হোক, ইন্টারভ্যালের জায়গাটা এলো, আমার খুব ভালোবাসার জায়গা। আমি তাপস সেনের কাছে গিয়ে বললাম, তিনজন বিচ্ছিন্ন মানুষ মঞ্চের ওপর এইরকম এইরকম করে রয়েছে। আপনার আলো দেখে যেন মনে হয়, এই তিনজন মানুষ খুব একা, পরস্পরের থেকে আলাদা।
কি বলবো আপনাদের, মানুষটা এক মুহূর্ত ভাবলেন না পর্যন্ত। যে ছেলেটি আলো করছিল তার নাম উত্তীয়, কোথা থেকে কোথা থেকে কি কি আলো দেবে মুখস্ত বলার মত বলতে আরম্ভ করলেন।আলোগুলো জ্বালানো হলো, তাপস সেন আমাকে বললেন দেখো বলে আবার মাথা নিচু করে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গেলেন। আর আমি দেখলাম মঞ্চে একটা অপরূপ পেইন্টিং তৈরি হয়ে গেছে।
প্রথম নাটক যযাতীয় নিয়ে একটা কাণ্ড হয়েছিল, সেই কথাটা এই ফাঁকে বলি। মনে আছে তো তাপস সেন বলেছিলেন আমি কিন্তু প্রফেশনাল। নাটক হয়ে গেছে, পরের দিন সকালবেলা তাপস সেনের ফোন। কি হলো আবার? 'সৌমিত্র, আমার জামার পকেটে একটা খাম পেলাম তাতে দু হাজার টাকা, ওটা কি তুমি দিয়েছো? আমি মিন মিন করে বললাম, 'হ্যাঁ মানে ওর চেয়ে বেশি আর--' ওপাশ থেকে উত্তর এলো,' না সে ঠিক আছে, কিন্তু আমি ভাবছি টাকাটা কে দিল। কখন যে তুমি দিয়েছো আর কখন পকেটে তুলেছি খেয়ালই করতে পারি নি। ফোন কেটে গেল। ওই যে বলছিলেন প্রফেশনাল, এই হল প্রফেশনালিজমের নমুনা।
তাপস সেন কেন বড় মাপের শিল্পী? এ বাবদে আমার একটা কথা মনে হয়। একজন মানুষ বড় মাপের শিল্পী হয়ে ওঠেন তখন, যখন তিনি তাঁর শিল্পের দিয়ে সেই শিল্পের মধ্যে নিহীত বিষয় এবং ব্যঞ্জনাকে শিল্পীত উপায়ে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
তাপস সেন অজস্র নাটকের আলোয় সেইটা করেছেন। এবং করেছেন কি অসম্ভব অপ্রতুলতা দিয়ে তা ভাবলে আশ্চর্য লাগে। যখন অঙ্গারের সেই বিখ্যাত খনিতে জল উঠে আসার দৃশ্য কল্পনা করছেন, তখন তাঁর হাতে কীই বা ছিল। এইরকম আরও অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
আমরা তাঁকে আলো নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করবার জন্যে একটা ল্যাবরেটরি তৈরি করে দিতে পারিনি। আমরা তাঁকে দিয়ে অনবরত মুজরো খাটিয়েছি। দুর্গা পূজার প্যান্ডেলে আলো করিয়েছি। কিন্তু জঞ্জালের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা রক্তকরবীর চারার মত তাপস সেন । অপ্রতিহত হয়ে থেকেছেন।
এই সহজ এবং অসম্ভব গুণী মানুষটিকে আমার প্রণাম।