থিয়েটার কেন? সৃজনশীলতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে এই শিল্পরূপটিকেই বেছে নেওয়ার কোনো বিশেষ কারণ ছিল?

মহেশ : এর কোনো নির্দিষ্ট যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই। থিয়েটার একটা শিল্পমাধ্যম। আমার কাছে এই মাধ্যমের আকর্ষণ অমোঘ এবং আমার পুরো কর্মজীবন জুড়েই থিয়েটার আমাকে আকর্ষণ করে এসেছে। বারো বছর বয়স থেকে আমি থিয়েটার নিয়ে আগ্রহী। প্রথম নাটক দেখে আমার অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু আশির দশকের শেষ দিকে আমাদের দেশে অপেশাদার থিয়েটারের উপস্থিতি খুবই কম ছিল। আমাদের দেশে ইংরেজিতে যাও বা দুএকটা নাটক হতো, সবই ইওরোপকেন্দ্রিক। সেই নাটকগুলো আমার খুব একটা ভালো লাগত না। তাই আমি একবারে একটা মধ্যবিত্ত ভারতীয় পরিবারকে নিয়ে নাটক লেখার সিদ্ধান্ত নিই এবং সেই নাটকটা খুবই জনপ্রিয় হয়। ইংরেজি নাটকের তুলনায় অনেক বৃহত্তর দর্শক সেই নাটক দেখেছিল এবং মানুষ গল্পটির সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পেয়েছিল। তারপর থেকেই আমি নিয়মিত নাটক লিখে চলেছি।

আপনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। আপনার কিছু সেরা স্মৃতির কথা জানতে চাই।

মহেশ : স্মৃতির সংখ্যা তো এত বেশি যে গুনে শেষ করা যাবে না। তবে যদি তার মধ্যে একটা বেছে নিতে হয়, তাহলে বলব, অ্যালিক পদমসির সঙ্গে সাক্ষাৎ। আমি যখন আমার Dance Like a Man নাটকটি নিয়ে বোম্বেতে গিয়েছিলাম, তখন সোফিয়া অডিটোরিয়ামে দর্শকসংখ্যা খুবই কম ছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন, যাঁকে বলা হত বিজ্ঞাপনের জগতে ‘ঈশ্বর’। তিনি অ্যালিক পদমসি। কথাটা খুব একটা মিথ্যে নয়। তিনি বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্র জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির কেরিয়ার তৈরি করেছেন। শিল্প ও বিনোদন জগতে শ্যারন প্রভাকর, দলীপ তাহিল, শিয়ামক দাভার এদের সবাইকেই অ্যালিক তুলেছেন।

শো শেষ হওয়ার পর তিনি ব্যাক স্টেজে আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন, আবার বাড়িতে ডাকলেন ডিনার খেতে। বুঝতেই পারছেন, আমি তো যাকে বলে সপ্তম স্বর্গে উঠে গেলাম। অ্যালিক আমাকে আমার পরবর্তী প্রযোজনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। সেই সময় আমি Twinkle Tara নামে একটা নাটক লিখছিলাম, সেটার কথাই বললাম। কনসেপ্টটা শুনেই ওঁর এতো পছন্দ হয়ে গেল যে, আমার প্রথম প্রযোজনার পর উনি নাটকটি পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেন। নামটা অবশ্য পরিবর্তন করে Tara রাখেন।

প্রথমদিকে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছিল যে আমার মনে হয়েছিল নাটকটাই অপয়া। কিন্তু সেই সমস্ত বাধা সত্ত্বেও অ্যালিকের পরিচালনায় Tara বিরাট সাফল্য অর্জন করে এবং অন্তত জাতীয় সংবাদমাধ্যমের চোখে আমাকে একজন সম্ভাবনাময় নাট্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আগামী প্রজন্মের পরিচালকদের জন্য আপনি কী বলতে চান?

মহেশ : আমি উপদেশ দিতে খুব একটা পছন্দ করি না। আমার মনে হয় নতুন প্রজন্ম জানে তারা কী করছে। তাই আমি শুধু এটুকুই বলব, তোমরা যা-ই করো না কেন, খোলা মন এবং খোলা হৃদয় নিয়ে করো।

আপনার কোন নাটকটি লেখা সবচেয়ে কঠিন ছিল বলে মনে হয়?

মহেশ : এটা বলা মুশকিল। নাটক তো একটা কনসেপ্ট থেকে জন্ম নেয়! কোনো কনসেপ্ট যদি দীর্ঘদিন আমার সঙ্গে থেকে যায়, তাহলে বুঝি সেটা নিয়ে কাজ আমাকে করতেই হবে। আমার কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ছিল 30 Days in September। নাটকটা এমন একটি সংস্থার অনুরোধে লেখা হয়েছিল, যারা যৌন নির্যাতনের শিকার মানুষদের কাউন্সেলিং করত। তখন ভারতে যৌন নির্যাতন নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি আলোচনা হত না। কিন্তু আমি সত্যিকারের ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম, কারণ আমার মনে হয়েছিল এটি প্রকল্পটির জন্য অত্যন্ত জরুরি। শেষ পর্যন্ত কিছু স্বেচ্ছাসেবককে পেয়েছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি শুধু এটাই বোঝার চেষ্টা করেছি যে কীভাবে তাঁদের গল্পগুলোকে যতটা সম্ভব সঠিকভাবে প্রকাশ করা যায়। তারপরে নাটকটা লিখেছি।

আপনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। প্রথম যখন জানতে পারলেন, তখন আপনার প্রতিক্রিয়া কী ছিল? এখন এই পুরস্কারের অর্থ আপনার কাছে কী?

মহেশ : আমার বাবা আমাকে ফোন করে বলেছিলেন। টিভিতে নাকি খবরে শুনেছেন যে আমি সাহিত্য আকাদেমি পেয়েছি। আমার বিশ্বাস হয়নি। আমি বাবাকে বললামযে, তিনি ভুল করছেন। তারপর কয়েকজন বন্ধু ফোন করল, কিন্তু তখনও আমি ব্যাপারটা ঠিক বলে ভাবতে পারছিলাম না। ভেবেছিলাম, হয়তো অন্য কোনো পুরস্কার হবে। এর দু'দিন পরে টেলিগ্রাম এল।

আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম। কারণ আমি নিজেকে সাহিত্যিক হিসেবে দেখি না; আমি নিজেকে থিয়েটারের মানুষ বলেই মনে করি। তবে এই পুরস্কার আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। বিশেষ করে আমি ইংরেজিতে ভারতীয় গল্প লিখি, আর সেই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এটি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় মঞ্চে ইংরেজি ভাষার থিয়েটারকে আপনি প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটি একটি বিশাল অর্জন। আপনি কি মনে করেন ইংরেজি নাটকের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিক্রিয়া রয়েছে?

মহেশ : আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পরে আমরাই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইংরেজিভাষী দেশ। কিন্তু আমাকে বেশি ভাবায় কোনো নির্দিষ্ট ভাষায় নাটক লেখা নয়, বরং নাট্যকারের অভাব। অনেক থিয়েটারশিল্পী বিদেশে কাজ করে আবার ভারতে ফিরে এসে থিয়েটার সংস্থা তৈরি করছেন। কিন্তু নাটক লেখা শেখানোর কোর্স খুবই কম। ফলে আমরা আবারও ইউরোপকেন্দ্রিক নাটকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি।

এইজন্যই আমি Play Pen নামে একটা দল শুরু করেছি। এখনো পর্যন্ত আমাদের চারটে নাটক পূর্ণাঙ্গভাবে মঞ্চস্থ হয়েছে। কিন্তু ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটিরও বেশি, আর এখনও থিয়েটার নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করে উঠতে পারেনি।

আপনি কিছু অসাধারণ চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন। ভবিষ্যতে আরও চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা আছে?

মহেশ : হয়তো। ব্যাপারটা কী জানেন, সিনেমা তৈরি একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যবস্থাপনা এবং নানা ধরনের সমন্বয় ও কৌশল জড়িত থাকে। কাজটা সোজা তো নয়। দেখা যাক কী হয়!

আপনার নাটক এবং পরে নির্মিত চলচ্চিত্র Dance Like a Man লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে কথা বলে। অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। আপনি কি মনে করেন পরিস্থিতি বদলেছে?

মহেশ : আমি যখন ওই নাটকটা লিখেছিলাম, তখন সময়টা আলাদা ছিল। এখন বিশ্বজুড়ে অনেক কিছু বদলেছে। কোথাও কোথাও সহনশীলতা বেড়েছে, আবার কোথাও এখনো পরিস্থিতি যে কে সেই! অনেকে এখনও অনেক পিছিয়ে আছেন। Dance Like a Goddess, বরং শিল্পীদের জন্য নতুন বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। আবার হয়তো এই একই বিষয় নতুন করে ভাবব। কে বলতে পারে!

আপনার সর্বশেষ নাটকটি এখন খুব জনপ্রিয়। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।

মহেশ : এই প্রযোজনায় আমি পরিচালক জোনাথন তাইকিনা টেলরের সঙ্গে কাজ করছি। ও ব্রুকলিনের লোক। নাটকটার নাম The Monk and the Warrior। গল্পটা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এবং একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে নিয়ে। কনসেপ্টটা কিন্তু জোনাথনের। আমি লিখেছি।

অনেক বড় প্রোডাকশন এটা। এতে আন্তর্জাতিক শিল্পীরা আছে। যদিও অনুপ্রেরণা এসেছে ইতিহাস থেকে, তবু আমি এই নাটকটাকে সমসাময়িক বলেই মনে করি। কারণ এর বিষয়বস্তু আজও প্রাসঙ্গিক। এ নাটক আমাদের ভাবতে শেখায় যে, আমরা কাদের নায়ক হিসেবে বেছে নিই। অনেক সময় যে জয়ী হয়, সেই নায়ক, আর অহিংসার পথ বেছে নেওয়া মানুষ ঠিক যেন হিরো নয়। কিন্তু এই নাটকে ব্যাপারটা একেবারে উল্টো। কাজটা সাফল্য পাচ্ছে সেটা যেমন আনন্দের, তার থেকেও বড় আনন্দ হল, নাটকটা লিখে আমার নিজেরই খুব ভালো লেগেছে।